প্রশ্ন : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার সমীপে সবিনয়ে নিম্নোক্ত প্রশ্ন পেশ করছি, ইনশাআল্লাহ জবাব দানে বাধিত করবেন।আমার দোতলা একটি বাসা আছে। তিনতলা করার জন্য মোট ১৫ লাখ টাকা লাগবে। আমার কাছে ৪ লাখ আছে। ইসলামী ব্যাংকের ‘হায়ার পার্চেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক’ স্কীমের আওতায় ব্যাংকের সাথে যৌথ উদ্যোগে আমি বাসা করতে পারব কি না?

উত্তর :

আমরা বরাবরই বলে আসছি বর্তমানে আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো পরিপূর্ন শরয়ী পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে না। এটা সল্প পরিসরে জনসাধারনকে বোঝান বেশ কঠিন। তবে এতটুকু তো সবারই বোধগম্য যে,ইসলামের শাখা সমূহের মধ্যে লেনদেন তথা ব্যবসা-বানিজ্যের ব্যাপারেই মানুষ সবচেয়ে উদাসীন। নামায,রোযা,হজ্জ,যাকাত ইত্যাদি বিষয়ে মানুষের কিছু আহকাম জানা থাকলেও লেনদেনের বিষয়ে কিন্তু মানুষ বেশ খানিকটা অজ্ঞ। আবার শুধুমাত্র এ সকল মাসায়েলের উপর অবগত হওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং এলেমের পাশাপাশি দ্বীনী মুল্যবোধও (তাক্বওয়া বা পরহেজগারী) থাকা জরুরী। যাতে এ সকল লেনদেন শরয়ী রূপরেখা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হয়। কাজেই যারা একদিক দিয়ে যেমন দ্বীনী মুল্যবোধহীন এবং অন্য দিক দিয়ে এ সকল মাসায়েলের ব্যাপারে অজ্ঞ তাদের দ্বারা যখন এ সমস্ত লেনদেন বাস্তবায়িত হবে তখন তা কেমন হবে বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই তা বুঝতে পারে।

Hire Purchase under shirkatul melk মুলত তিনটি চুক্তির সমন্বয়।

(১) شركة الملك(Joint ownership) যৌথ মালিকানা।

(২) اجارة (Hire) ভাড়া।

(৩) بيع (Sale) বিক্রি।

লেনদেনটির স্বরূপ হল,ধরুন ব্যাংক ও গ্রাহক মিলে যৌথভাবে প্রত্যেকে ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি বাড়ি ক্রয় করল বা বানাল। এখন উভয়ের উক্ত বাড়িটিতে আধা-আধি মালিকানা সাব্যস্ত হল। এবার ব্যাংক তার মালিকানাধীন অংশটি গ্রাহকের নিকট ভাড়া দিবে।

অতঃপর ব্যাংক তার মালিকানাধীন অংশটি কয়েকটি unit (অংশে) এ বিভক্ত করবে। এরপর উভয় পক্ষ একটি সময়সীমা (যেমন- ১মাস/ ৩মাস/ ৬মাস/ এক বছর ইত্যাদি)নির্ধারণ করবে। যে সময়সীমায় গ্রাহক ব্যাংকের মালিকানাধীন একেকটি করে unit ক্রয় করতে থাকবে। এক সময় গ্রাহক উক্ত বাড়ির নিরঙ্কুশ মালিকানা অর্জন করবে। আর যখন গ্রাহক একেকটি করে ইউনিট ক্রয় করবে তখন তার থেকে উক্ত হারে ভাড়াও কমতে থাকবে।

যেমন আমাদের উল্লেখিত উদাহরণে ব্যাংকের মালিকানাধীন অংশকে যদি দশটি ইউনিটে বিভক্ত করা হয় তবে প্রত্যেক unit এর মুল্য পড়বে এক লক্ষ টাকা। এখন গ্রাহক যদি এক মাস অন্তর অন্তর একেকটি unit ক্রয় করে তবে দশ মাসে সে পূরো বাড়িটির মালিক হবে। আর যদি বাড়িটির ভাড়া ২০ হাজার টাকা ধরে নেওয়া হয় তবে গ্রাহক প্রথম মাসে ভাড়া দিবে দশ হাজার টাকা। অতঃপর যখন পরের মাসে একটি ইউনিট ক্রয় করবে তখন ভাড়া দিবে ৯ হাজার টাকা। এভাবে সে একেকটি করে unit ক্রয় করতে থাকবে এবং তার মালিকানা বাড়তে থাকবে। আর সে অনুপাতে তার ভাড়াও কমতে থাকবে। এক সময় সে পূরো বাড়িটির মালিক হয়ে যাবে।

এই চুক্তির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয় –

১। যৌথ মালিকানা,ভাড়া এবং বিক্রয় এই চুক্তিগুলো এক সাথে হতে পারবে না। অনুরূপভাবে একটির জন্য আরেকটি শর্ত হতে পারবে না। যদি শর্ত করা হয় তবে তা জায়েজ হবে না। একাধিক সহীহ হাদীসে একটি চুক্তির সাথে আরেকটি চুক্তি মিলানো বা কোন শর্ত দেওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে।

২। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষ যৌথ মালিকানা অর্জনের আগে বা পরে Agreement বা ওয়াদা করবে যে,তারা অমুক দিন ইজারার চুক্তি করবে এবং অমুক দিন বিক্রির চুক্তি করবে। তিনটি চুক্তির কোনটির সময় অন্য কোন চুক্তির ব্যাপারে কথা বলবে না।

৩। গ্রাহকের মালিকানা যে অনুপাতে বাড়বে সে অনুপাতে তার থেকে ভাড়া কমতে থাকবে।

৪। কোন unit এর মুল্য  নির্দিষ্ট মেয়াদে গ্রাহক যদি দিতে অক্ষম হয় তবে তার বিপরীতে মুনাফার নামে কোন অংশ বাড়ানো যাবেনা। যা স্পষ্ট সুদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা কোন unit ক্রয় করতে বিলম্ব হলে ব্যাংক তো তার ভাড়া পাচ্ছে।

৫। প্রতিটি চুক্তি বাস্তবে আলাদাভাবে অস্তিত্বে আসতে হবে। চুক্তিগুলো শুধুমাত্র কাগজ কলম থেকে বাস্তবে টাকার লেনদেন না হতে হবে।

আমি নিজে একবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর ঢাকার দুটি শাখায় (শ্যামলী ও আদবর যা বর্তমানে কৃষি মার্কেট এলাকার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে) গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল Hire Purchase under shirkatul melk এর স্বরূপ উদঘাটন। ব্যাংকের ম্যানেজার ও কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কথা হয়। দেখলাম বিক্রয়,ভাড়া এসবের আলাদা চুক্তির কোন বালাই নেই। ব্যাংক যৌথভাবে কোন কিছু ক্রয় করে দেবার পর আমাকে তা নির্দিষ্ট হারে মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। কোন কিস্তি ফেল করলে তার বিপরীতে মুনাফার নামে একটি চার্জ যুক্ত হবে। আমি ম্যানেজার সাহেবকে বললাম,সর্বদা একই রকম কিস্তি কেন হবে?আমি যখন কোন অংশ ক্রয় করব তখন সে অনুপাতে আমার ভাড়া তো কমে যাবে। তখন তিনি আমাকে বললেন আমরা সেভাবেই ধার্য্য করে গড়ে একটা মুল্য নির্ধারণ করি। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে তিনি বলে ফেললেন, আপনারা (হুজুররা) টাকার বিপরীতে টাকা বাড়লেই সূদ মনে করেন,যা ঠিক নয়,এর পর আমি চলে আসি।

যাই হোক,আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো এমন খামখেয়ালীর ভিত্তিতেই চলে থাকে। অধিকাংশ লেনদেন তারা সহীহ পদ্ধতিতে করে না। কাগজ কলমে কিছুটা ইসলাম থাকলেও কার্য্যক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত।

আপনি Hire Purchase under shirkatul melk এর ভিত্তিতে লেনদেন করতে চাইলে উপরে উল্লেখিত নিয়মে যদি ব্যাংক করতে চায় তবে করতে পারেন নতুবা নয়।

সূত্র সমূহ

সূরা বাকরাহ,আয়াত ২৭৫ ;মুসনাদে আহমাদ,হাদীস নং ৯৫৮৪ ;সহীহুল বুখারী,হাদীস নং ২০৬০ ;সুনানে নাসাঈ,হাদীস নং ৪৬৪৩ ;সুনানে তিরমিযী,হাদীস নং ১২৩১ ;আল মুগনী, ইবনে কুদামাহ ৬/১৩৭, ৪/২৯০; রদ্দুল মুহতার ৩/৩৬৫, ৪/১৩৫; জামেউল ফুসুলাইন ২/২৩৭; ফিকহী মাকালাত, তাকী উসমানী ২৩১-৩৪৬।

668,605 total views, 1,914 views today