আল্লাহ তাআলা বছরের কিছু মাস, দিন ও রাতকে সম্মানিত ও মহিমান্বিত করেছেন। কিছু দিন, রাত ও মাসকে অন্যান্য দিন, রাত ও মাসের চেয়ে অধিক ফযীলতপূর্ণ বানিয়েছেন। যেমন লাইলাতুল কদর, জিলহজের প্রথম দশ দিন, শবে বরাত, জুমুআর দিন, আরাফার দিন ইত্যাদি। তবে কোন দিন, রাত, মাস বা কোন একটি মুহুর্তকেও আল্লাহ তাআলা অশুভ বা অকল্যানকর বানাননি। বরং প্রত্যেকটি মুহুর্তই আল্লাহ তাআলার অশেষ নিআমত। বান্দা যে কোন মুহূর্তকেই কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলার মাহবূব বান্দায় রূপান্তরিত হতে পারে।

কোন সময়কে অশুভ মনে করা বা বিশেষ কোন সময়কে বিশেষ কোন কাজের জন্য অশুভ বা অকল্যানকর মনে করা এগুলো সব জাহিলিয়্যাতের কুসংস্কার ও গর্হিত কাজ। জাহেলিয়্যাতের যুগে কেউ কেউ এ ধারণা পোষণ করত যে, শাওয়াল মাসে বিবাহ করলে তা অশুভ ও অকল্যানকর হয়। ঐ বিবাহে কোন বরকত থাকে না। তাই হযরত আয়েশা (রাঃ) তাদের এই ভিত্তিহীন ধারণাকে খন্ডন করে বলেন-
تزوجنى رسول الله -صلى الله عليه وسلم- فى شوال وبنى بى فى شوال فأى نساء رسول الله -صلى الله عليه وسلم- كان أحظى عنده منى
অর্থঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে শাওয়াল মাসেই বিবাহ করেছেন এবং শাওয়াল মাসেই বাসর রাত উদযাপন করেছেন। অথচ তার অনুগ্রহ লাভে আমার চেয়ে অধিক সৌভাগ্যবতী স্ত্রী আর কে ছিল?-সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫৪৮

আমাদের সমাজেও বর্তমানে অনেককে দেখা যায় যারা এ ধরনের বিভিন্ন অমূলক বা ভিত্তিহীন ধারনা রাখে। যেমন ঝাড়ুর আঘাত লাগলে শরীর শুকিয়ে যাবে, আলোচিত ব্যক্তি এলে সে দীর্ঘজীবী হবে, দোকান খোলার পরেই বাকি দিলে সারাদিন বাকি যাবে, পেচা ডাকলে ঘরবাড়ি বিরান হয়ে যাবে, যাত্রা পথে হোঁচট খেলে বা কোন বাধা পেলে তা অশুভ হবে, চোখ লাফালে বিপদ আসবে, শনিবার সফর করা যাবে না, রাতে বাসি পানি ফেলা যাবে না ইত্যাদি। এছাড়াও আরো অসংখ্য কুসংস্কার সমাজে পরিলক্ষিত হয়। অথচ এগুলোর প্রত্যেকটি ঈমান বিধ্বংসী আকীদা। এর নেপথ্যে রয়েছে আল্লাহ তাআলার কুদরতকে অস্বীকার করা এবং শিরকের ভয়াবহ দাবানলে নিজেকে ঠেলে দেওয়া। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
الطِّيَرَةُ شِرْكٌ
অর্থঃ অশুভ মনে করা শিরক।- সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৯১২
এই কথাটি الطِّيَرَةُ شِرْكٌ অর্থাৎ “অশুভ মনে করা শিরক” তিনবার বলেছেন।

অনেককেই দেখা যায় তারা মুহররম মাসকে অশুভ মনে করে। অনেকেই এ মাসে বিবাহ করতে চায় না। কারণ এ মাসে হযরত হুসাইন (রাঃ) শহীদ হয়েছিলেন। আচ্ছা এমন কোন মাস কি রয়েছে যে মাসে কোন মহান ব্যক্তিত্বের শাহাদাতের ঘটনা ঘটেনি? তাহলে কি সব মাসই অশুভ হয়ে যাবে? অথচ মুহাররম মাসে আশুহুরে হুরুম তথা মর্যাদাপূর্ণ চারটি মাসের মধ্যে অন্যতম একটি। বরং রমযান মাসের পর এ মাসেরই গুরুত্ব ও ফযীলাত সবচেয়ে বেশী।

অনুরূপভাবে ইসলামপূর্ব যুগে মানুষের মাঝে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল যে, সফর মাস অশুভ। এ মাসে কোন খায়ের ও বরকত নেই। তাই তারা এ মাসে কোন সফর করত না। আসলে এগুলো সবই কুসংস্কার ও শিরকী আক্বীদা। এর দ্বারা ভাল-মন্দ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যের নিকট ন্যস্ত করা হয়। এগুলো সব হিন্দুয়ানী তরীকা। তারা প্রতিটি কদমে কদমে শুভ-অশুভ তালাশ করে। তারা গ্রহ নক্ষত্রের কাল্পনিক প্রভাব বা নানা ধরনের অলীক ধারনার ভিত্তিতে এ জাতীয় অর্থহীন বিষয়াদি উদ্ভাবন করেছিল। তাদের নিকট মন্দের দেবতা ভিন্ন।

এ ধরনের অবাস্তব ও অমূলক ধ্যান-ধারনা যারা পোষণ করে তাদের মন-মগজে এমন এমন ভিত্তিহীন বিষয়াবলী স্থান পেতে থাকে যা মানব জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এগুলোর পিছনে পড়ার দরূন মানুষ যেমনি ভাবে হতাশাগ্রস্ত হতে থাকে তেমনি ভাবে রীতি ও রেওয়াজের কাল্পনিক বোঝা ঘাড়ে চাপার দরূন জীবন সংকীর্ণ হতে থাকে। তার সামনে দুঃশ্চিন্তা ও ভয়-ভীতির অসংখ্য ছিদ্রপথ উন্মুক্ত হতে থাকে। এটা করা যাবে না, সেটা করা যাবে না, এখন করা যাবে না, তখন করা যাবে না, এভাবে করা যাবে না, সেভাবে করতে হবে এমন কত যে কাল্পনিক রূপরেখা তার সামনে ভাসতে থাকে তার কোন ইয়াত্তা নেই। ইসলাম মানুষকে এ সকল অলীক, অবাস্তব, কাল্পনিক ও কুসংষ্কার মূলক চিন্তাধারা থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে স্থিরতার সাথে জীবন যাপনের পথকে সুগম করেছে।

তাইতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল অশুভ কুলক্ষনকে মূলোৎপাটন করে ইরশাদ করেছেন-
لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ
অর্থঃ রোগ লেগে যাওয়া নেই, কোন অশুভ নেই, যে মরে যায় সে আর দুনিয়াতে ফিরে আসবে না, তোমরা সফর মাসকে অশুভ মনে করো না।–সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭৫৭

হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। প্রথম অংশটি যদিও প্রাসঙ্গিক নয় তবুও এর সাথে আকীদা সম্পৃক্ত হওয়ার কারনে এর আলোচনা সঙ্গত মনে করছি।

১। কোন রোগ লেগে যাওয়া নেইঃ
অর্থাৎ কোন রোগের স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে একজনের শরীর থেকে উড়ে এসে অপর জনের শরীরে লেগে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। অন্য হাদীসে রয়েছে-
فِرَّ مِنْ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ
অর্থঃ কুষ্ঠরোগী থেকে ঐভাবে পলায়ন কর যেভাবে তুমি সিংহ থেকে পলায়ন কর।–সহীহুল বুখারী ৭/১২৬ (শামেলা); মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৯৭২২

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلَا تَقْدَمُوا عَلَيْهِ
অর্থঃ যখন তোমরা কোন স্থানে মহামারীর কথা জানতে পারবে সেখানে যাবে না।–সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৩৪৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯০৩

অন্য হাদীসে রয়েছে-
لا يورد ممرض على مصح
অর্থঃ কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে।–সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯২২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৯২৬৩

উপরোক্ত হাদীসগুলো বাহ্যিকভাবে প্রথম হাদীসের বিপরীত মনে হয়। প্রথম হাদীস থেকে মনে হয় রোগের কোন সংক্রমন নেই। একজনের শরীর থেকে রোগ অপরের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে না। আর পরের হাদীসগুলো থেকে মনে হয় রোগের সংক্রমন হয়। সংক্রমন না হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুষ্ঠরোগী দেখে পলায়ন করতে, অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের সাথে না মিলাতে এবং মহামারীযুক্ত এলাকায় গমন না করতে বলতেন না।

উভয় প্রকার হাদীসের মধ্যে সমন্বয় হল, যেটা হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) ফাতহুল বারীতে লিখেছেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগ সংক্রমিত না হওয়ার ব্যাপারে যে কথা বলেছেন তার অর্থ হল, কোন রোগ নিজ থেকে অপরের নিকট সংক্রমিত হতে পারে না। জাহিলিয়্যাতের যুগে মানুষ এই ধারণা পোষণ করতে যে, রোগ আল্লাহ তাআলার হুকুম ব্যতীতই স্বয়ংসর্ম্পূণভাবে অপরের নিকট সংক্রমিত হয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এই ভিত্তিহীন ধারনাকে উক্ত হাদীস দ্বারা বাতিল সাব্যস্ত করেছেন। এমনকি তিনি কুষ্ঠরোগীর সাথে একত্রে খেয়েছেন যাতে মানুষ জানতে পারে সুস্থ ও অসুস্থ করার মালিক কেবল আল্লাহ তাআলাই। অন্যদিকে তাদের নিকটে যেতে নিষেধ করেছেন যাতে তাদের নিকট স্পষ্ট হয় যে, এই নিকটবর্তী হওয়াকে আল্লাহ তাআলা এমন একটি মাধ্যম বানিয়েছেন যার দ্বারা আল্লাহ তাআলার হুকুমে রোগ অন্যের মধ্যে সংক্রমিত হয়। কাজেই কুষ্ঠরোগ থেকে দূরে থাকতে বলার হাদীস থেকে বুঝে আসে রোগ সংক্রমনের মাধ্যম বা সাবাব থাকতে পারে। আর আল্লাহ তাআলার রাসূলের কুষ্ঠরোগীর সাথে খেতে বসা মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে, কোন রোগ নিজ থেকেই আল্লাহ তাআলার হুকুম ব্যতীত সংক্রমন হয় না বা লেগে যায় না। বরং আল্লাহ তাআলা চাইলে তার শক্তিকে নষ্ট করে দেন ফলে তা অন্যের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা চাইলে তার ক্রিয়াকে বাকী রাখেন ফলে অন্যরাও আল্লাহ তাআলার হুকুমে অসুস্থ হয়ে যায়”।–ফাতহুল বারী ১০/১৬০

একদা এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি যে বলেন, রোগের সংক্রমণ নেই তাহলে একটি উটের যখন চুলকানী হয় তখন তার আশপাশের উটগুলোরও তো হয়, এটা কেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে বলো প্রথম উটের মধ্যে কে সংক্রমণ ঘটিয়েছে? অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এটা বুঝালেন, প্রথম উটের যেভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুমে চুলকানী হয়েছে অন্যগুলোরও সেভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুমেই হয়েছে।(সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯১৯)

শাইখুল ইসলাম মুফতী তাক্বী উসমানী (দাঃ বাঃ) এ বিষয়ে লম্বা আলোচনা করে সর্বশেষে বলেন- “সার কথা যদি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন কোন রোগের জীবানু একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে স্থানান্তরিত হয় তবে এর সাথে ঐ সকল হাদীসের কোন সংঘর্ষ নেই যেগুলোতে সংক্রমনকে অস্বীকার করা হয়েছে। বরং হাদীস শরীফে যেটাকে অস্বীকার করা হয়েছে সেটা হল আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি করা ব্যতীত কোন কিছুর স্বয়ংসম্পূর্নভাবে ক্রিয়াশীল হওয়া। এটি নিঃসন্দেহে কুফরী ও শিরকী আকীদা। আর এ বিশ্বাস রাখা যে, রোগের জীবানুর স্থানান্তর কখনো কখনো অসুস্থতার কারণ হয় (যেমন ছুরিতে হাত কেটে যায়, বিষ খেলে মানুষ মারা যায় ইত্যাদি) আর সেটা আল্লাহ তাআলার হুকুম ও ইচ্ছাতে এভাবে হয় যে, যদি আল্লাহ তাআলা সেটা না চান তবে জীবানু স্থানান্তরিত হয় না অথবা স্থানান্তরিত হয় কিন্তু তা অসুস্থ করে না তবে এটা সম্পূর্ণ সহীহ আকীদা। শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে এতে কোন বাঁধা নেই। আর হাদীসের সাথেও এর কোন সংঘর্ষ নেই। …….. কাজেই (বিভিন্ন রোগীদের থেকে দূরে থাকা বা বেঁচে থাকার চেষ্টা করা) তাওয়াক্কুল ও তাকদীরের বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এই আকীদা পোষণ করে যে, ঐ সকল জীবানুর প্রভাব স্বয়ংসম্পূর্ন নয়। বরং তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার উপর মওকূফ।–তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ৪/৩২৫

২। কোন অশুভ (বা কুলক্ষন) নেইঃ
এখানে হাদীস শরীফে طِيَرَةَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর উক্ত শব্দটি উদগত হয়েছে طير থেকে। যার অর্থ হল পাখি। আরবে শুভ অশুভ নির্নয়ের এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, কেউ কোন কাজের ইচ্ছা করলে পাখি উড়িয়ে দিত। যদি পাখি ডান দিকে উড়ে যেত তবে তারা শুভলক্ষণ মনে করত। আর বাম দিতে উড়ে গেলে অশুভ মনে করত এবং উদ্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকত। পরবর্তীতে যে কোন কুলক্ষনই طِيَرَةَ হিসেবে প্রসিদ্ধী লাভ করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সকল অলীক ও ভিত্তিহীন চিন্তাধারাকে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন। শুধু তাই না বরং এগুলোকে স্পষ্ট শিরক আখ্যায়িত করেছেন। এগুলো ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। মুমিন তো একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই সকল কল্যান ও অকল্যানের মালিক মনে করবে। সে কখনো কুলক্ষণ বা অশুভ এর পিছনে পড়বে না। কোন কিছুকে অশুভ বা অকল্যান মনে করার অর্থ হল উক্ত জিনিসটি অকল্যানের মালিক মনে করা। যা স্পষ্ট শিরক।

তাছাড়া যারা এ সকল অবাস্তব ও কাল্পনিক বিষয়ের পিছনে পড়ে তাদের জীবন যে কতটা সংকীর্ণ ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠে তা বলাই বাহুল্য। ইসলাম মানুষকে এ সকল যন্ত্রনা থেকে নিঃস্কৃতি দিয়েছে। খাঁটি মুমিনের মনে-মানসে, মগজে একটি মাত্র সত্তা থাকে। আর তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। যার ইশারায় সকল কল্যান অকল্যান সংঘটিত হয়।

তবে ইসলাম “শুভ” কে সমর্থন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا طِيَرَةَ وَخَيْرُهَا الْفَأْلُ قَالُوا وَمَا الْفَأْلُ قَالَ الْكَلِمَةُ الصَّالِحَةُ يَسْمَعُهَا أَحَدُكُمْ
অর্থঃ কোন অশুভ নেই। তবে সর্বোত্তম হল শুভ গ্রহন করা। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঐ উত্তম বাক্য যা তোমাদের কেউ শুনে।–সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭৫৪

যেমন কোন অসুস্থ ব্যক্তি কাউকে ডাকতে শুনল, হে সালেম! (সালেম এর অর্থ হল নিরাপদ, সুস্থ) একথা শুনে অসুস্থ ব্যক্তির অন্তরে দ্রুত সুস্থতার আশা উদয় হল।
হাদীস শরীফে রয়েছে –
أن النبي صلى الله عليه و سلم كان يعجبه إذا خرج لحاجة أن يسمع يا راشد يا نجيح
অর্থঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন প্রয়োজনে বের হলে হে নাজীহ! (যার অর্থ সুস্থ, সঠিক) অথবা হে রাশেদ! (যার অর্থ হেদায়েত প্রাপ্ত) শুনতে পছন্দ করতেন।- সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং ১৬১৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভ গ্রহণ করা পছন্দ করতেন এজন্য যে, মানুষ যখন কোন শক্তিশালী বা দূর্বল মাধ্যমের দ্বারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে করুনা বা ফায়েদার আশা করে তখন আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারনা পোষন করা হয়। আর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে করুনার আশায় কেবল কল্যানই রয়েছে। পক্ষান্তরে অশুভ এর মধ্যে আল্লাহ তাআলার প্রতি খারাপ ধারনা পোষণ করা হয়।

৩। পেঁচাতে কোন অশুভ নেই অথবা পূনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসা নেইঃ
আরবের লোকেরা ধারনা করত মৃত ব্যক্তির শরীর যখন পঁচে গলে মাটির সাথে মিশে যায় তখন তা পেঁচার রূপ ধারন করে কবর থেকে বের হয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে। পরিবার পরিজনের খোঁজ খবর নিয়ে যায়। দেখে কেউ তার জন্য দুআ করছে কিনা? এজন্যই এখনো অনেককে দেখা যায় রাতে বাইরে পানি ফেলে না। কারণ পানি ফেললে তা মৃত ব্যক্তির গায়ে গিয়ে পড়বে ফলে তিনি কষ্ট পাবেন। আবার কেউ ধারণা করতো কোন বাড়ির ছাদে বা গাছের ডালে পেঁচা বসলে সেখানে কেউ মারা যাবে অথবা তাদের কোন বিপদ আসবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এসকল ভ্রান্ত ধারনাকে ভিত্তিহীন ও বাতিল সাব্যস্ত করেছেন উক্ত হাদীসে। না মৃত ব্যক্তি পেঁচার রূপ নিয়ে দুনিয়াতে ফিরে আসে আর না পেঁচার কারনে কারো মৃত্যু বা ক্ষতি হয়। বরং জীবন-মৃত্যু, ভালো মন্দ সবকিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পূর্ব নিধারিত এবং নির্ধারিত সময়ে আল্লাহ তাআলার হুকুমে এগুলো বাস্তবায়িত হবেই। এর সাথে পেঁচার কোন সম্পর্ক নেই। বরং এগুলো কুসংস্কার ও শিরকী আকীদাহ।

তবে মানুষের গোনাহের কারণে বিপদ আপদ এসে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
অর্থঃ মানুষ নিজ হাতে যা কামায় (অর্থাৎ যে গুনাহ করে), তার ফলে স্থলে ও জলে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কতক কৃতকর্মের স্বাদ গ্রহন করাবেন সে জন্য; হয়ত (এর ফলে) তারা ফিরে আসবে।–সূরা রোম, আয়াত ৪১

এর জন্য তাওবা ও ইস্তেগফারের রাস্তা খোলা রয়েছে। কাজেই কারো থেকে কোন গোনাহ প্রকাশ পেয়ে গেলে সে তাওবা ও ইস্তেগফার করবে এবং গোনাহের অকল্যান থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট পানাহ চাবে ও দুআ করবে।

৪। সফর মাসে অশুভ কিছু নেইঃ
জাহেলী যুগে মানুষ সফর মাসকে অশুভ মনে করত। তারা মনে করত এ মাসের কোন খায়ের ও বরকত নেই। তাই তারা এ মাসে সফর করত না এবং ভালো কিছু শুরু করতে চাইত না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এই ভ্রান্ত ধারনাকে বাতিল করে দিয়েছেন। কোন মাস, দিন বা ক্ষণের মধ্যে অকল্যান বলতে কিছু নেই। এগুলো সব মানুষের কাল্পনিক ও অবাস্তব চিন্তাধারা। বরং প্রতিটি মুহুর্তই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অশেষ নিআমত। বান্দা প্রত্যেকটি মুহুর্তকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দায় রূপান্তরিত হতে পারে।

তাই তার সময়ের শুভ-অশুভ এর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে প্রতিটি মুহুর্ত মূল্যায়নের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।

আখেরী চাহার শোমবাহঃ
সফর মাসে আলোচিত আরেকটি বিষয় হচ্ছে “আখেরী চাহার শোমবাহ”। “আখেরী চাহার শোমবাহ” কথাটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। যার অর্থ হল “শেষ বুধবার”। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সফর মাসের শেষ বুধবার। জনমনে এটা প্রসিদ্ধ যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অসুস্থতায় রবিউল আওয়াল মাসে ইনতিকাল করেন, সে অসুস্থতা থেকে সফর মাসের শেষ বুধবারে অর্থাৎ আখেরী চাহার শোমবায় কিছুটা সুস্থতা বোধ করেছিলেন, তাই এ দিবসটিকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করা হয়। অথচ বিশুদ্ধ বর্ণনার আলোকে এ তথ্য সঠিক নয়। বরং সহীহ বর্ণনায় রয়েছে, এ বুধবারেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে যায়। কাজেই যে দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে যায়, সেদিন কোন মুসলমানের জন্য খুশির দিন হতে পারে না। সারকথা, এই দিনকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করা এবং ছুটি পালন করা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

 532 total views,  2 views today