আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে বলে দিয়েছেন-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ
অর্থাৎ তোমরা যদি না জেনে থাক তবে আহলে যিকিরদেরকে জিজ্ঞাসা কর। (সুরা নাহল আয়াত-৪৩ )
মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন উক্ত আয়াতে আহলে যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হল উলামায়ে কেরাম। আর উক্ত হুকুম হল সাধারন মানুষের জন্য। অর্থাৎ সাধারন মানুষ কোন বিষয় না জেনে থাকলে তার দায়িত্ব হল ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করে তদ্বানুযায়ী আমল করা। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা বলেননি যে, তোমরা না জেনে থাকলে কুরআন ও হাদীস গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করবে। অথচ আমাদের মধ্য থেকে কিছু ভাই এমন আছেন যারা নিজেরাই কুরআন-হাদীস গবেষণা করে আমল করতে চান। যদিও তিনি আলেম নন। আবার দলিল হিসাবে পেশ করেন –
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
অর্থ- আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য তবে আছে কি কোন উপদেশ গ্রহনকরী? (সূরা কমার আয়াত -১৭)
তারা বলে কুরআন তো খুবই সহজ। যা আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলে দিয়েছেন। কাজেই তা গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করাতে অসুবিধা কোথায়? অথচ আয়াতের অর্থ থেকে যে কেউ অতি সহজেই বুঝতে পারবে যে, কুরআনকে সহজ করা হয়েছে উপদেশ গ্রহণের জন্য হুকুম আহকামের উপর আমল করার জন্য নয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে পূর্ববর্তী উম্মতের যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাদেরকে যে নছীহত করেছেন, আল্লাহ তা’আলার হুকুম পালনার্থে তাদেরকে যে নেয়মত দান করেছেন এবং হুকুম না মানার কারনে যে আযাব দিয়েছেন তা যে কেউ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবে।অপর দিকে কুরআন থেকে মাসআলা নিঃসরণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। তা কেবল মুজতাহিদের পক্ষেই সম্ভব।নিন্মের আয়াতটিতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে-
إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً

অর্থঃ অচিরেই আমি আপনার উপর কিছু ভারী কথা অবতীর্ণ করব। (সূরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত-৫)
অনুরূপভাবে হাদীস থেকে হুকুম আহকাম বের করাও অত্যন্ত কঠিন কাজ। সাধারন মানুষের জন্য তা একেবারেই অসম্ভব। কেননা মুহাদ্দিছীনদের দায়িত্ব শুধু মাত্র হাদীস জমা করে দেওয়া। তারা আমলযোগ্য হাদীস ও আমলবিহীন হাদীসের মেধ্য কোন পার্থক্য করেন না । তাই হাদীসের কিতাবসমূহে সর্ব প্রকার হাদীস বিদ্যমান থাকে। যেমন-
(১) রহিত হাদীস সমূহ।
(২) মারজুহ তথা অনাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হাদীস ।
(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীস।
(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ হাদীস।
(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছ হাদীস ।
(৬) মওজু তথা জাল হাদীস।
এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের হাদীস থাকে। উপরে উল্লেখিত ১ম, ২য় ও ষষ্ট প্রকার কোন অবস্থাতেই আমলযোগ্য নয়। তৃতীয়,চতুর্থ ও পঞ্চম প্রকার ক্ষেত্রবিশেষে আমলযোগ্য হতে পারে। সর্বাবস্থায় নয়। বিষয়টিকে ভালোভাবে স্পষ্ট করার জন্য প্রতিটি প্রকারের একটি করে উদহারন নিম্নে দেওয়া হল।
(১) রহিত হাদীসঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعًا

অর্থঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কুকুর তোমাদের কারো পাত্রে পানি পান কর, সে যেন উক্ত পাত্র সাত বার ধুয়ে নেয়। (বুখারী শরীফ হাদীস নং-১৭২)
(২) মারজূহ হাদীসঃ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْمَاءِ وَمَا يَنُوبُهُ مِنَ الدَّوَابِّ وَالسِّبَاعِ فَقَالَ -صلى الله عليه وسلم- « إِذَا كَانَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يَحْمِلِ الْخَبَثَ
অর্থঃ হযরত ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যা মরুভূমিতে নিচু জায়গায় জমে থাকে এবং যেখানে চতুস্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণী আসা যাওয়া করে। তিনি বললেন, পানি যখন দুই মটকা পরিমান হয় তখন তা আর নাপাক হয় না।(আবূ দাউদ শরীফ হাদীস নং-৬৩)
(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীসঃ
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَتَوَضَّأُ مِنْ بِئْرِ بُضَاعَةَ وَهِيَ بِئْرٌ يُطْرَحُ فِيهَا لُحُومُ الْكِلَابِ وَالْحِيَضُ وَالنَّتَنُ فَقَالَ الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ

অর্থঃ আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আমরা কি বুজাআহ নামক কুয়া থেকে উযূ করব? আর তা এমন একটি কুয়া যেখানে মহিলাদের হায়েযের নেকড়া,মৃত কুকুরসমূহ এবং নাপাক বস্তুসমূহ ফেলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,পানি পবিত্র। তাকে কোন বস্তু নাপাক করতে পারে না। (নাসাই শরীফ হাদীস নং-৩২৬)
(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছঃ
عن أبي هريرة Y أن رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا كان أحدكم في المسجد فوجد ريحا بين أليتيه فلا يخرج حتى يسمع صوتا أو يجد ريحا
অর্থঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে থাকে আর সে তার পায়ু পথে বায়ু অনুভব করে,সে ততক্ষণ পর্যন্ত (উযূর নিয়তে) বাহির হবে না যতক্ষণ না সে শব্দ শুনে বা গন্ধ পায়। (তিরমিজী শরীফ হাদীস নং-৭৫)
হাদীস থেকে বুঝা যায়। কারো বায়ু নির্গমন হওয়া সত্তেও যদি সে শব্দ না শুনে বা গন্ধ না পায় তাহলে তার উযূ ভঙ্গ হবে না। হাদীসটি সম্পূর্ন সহীহ।
(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছঃ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَمَرَ بِقَتْلِ الْكِلاَبِ
অর্থঃ ইবনে উমর(রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরকে হত্যা কারার জন্য আদেশ দিয়েছেন।(মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৯৮৮)
(৬) জাল হাদীসঃ
عن جابر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من كثرت صلاته بالليل حسن وجهه بالنهار

অর্থঃ হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ,যার রাতে (তাহাজ্জুদ) নামাজ বেশি হয় দিনে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়। (ইবনে মাজাহ হাদীস নং ১৩৩৩)
উপরে উল্লেখিত হাদীসসমূহের মধ্যে ১ম হাদীসটি তিনবার ধোয়ার হাদীস দ্বারা রহিত হয়ে গিয়েছে। ২য় হাদীসের বিপরিতে রয়েছে স্থির পানিতে পেষাব করার নিষেধাজ্ঞার হাদীস। যা দ্বারা উল্লেখিত হাদীসটি মারজূহ হয়েছে। ৩য় হাদীসের হুকুমটি বুজাআহ নামক কুপের সাথে খাছ ।৪র্থ হাদীসটি ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ যে ওয়াসওয়াসার রোগে আক্রান্ত। ৫ম হাদীসটি ইসলামের প্রথম যুগের জন্য খাছ। যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গিয়েছে।
একারনেই উলামায়ে কেরাম সাধারন মানুষেন জন্য কোন আলেমের নেগরানী ও পরামর্শ ব্যতীত হাদীস অধ্যায়ন করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এটা তাদেরকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে।বিখ্যাত তা‘বে তাবেঈন লাইস বিন সা‘দ বলেছেন-
الحديث مضلة الا للعلماء.
অর্থঃ উলামা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস গোমরাহীর করণ।
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন-
الحديث مضلة الا للفقهاء.
অর্থঃ ফুকাহা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস পথ ভ্রষ্টতার কারন।
অথচ আমাদের মধ্য থেকে কিছু ইংরেজি শিক্ষিত ভাই আছেন তারা নিজেরাই হাদীস অধ্যয়ন করে তদানুযায়ী আমল করতে চেষ্টা করেন। তারা নিজেদেরকে আহলে হাদীস বলে দাবী করেন। পূর্বের আলোচনর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে সমুদ্রতুল্য হাদীস ভান্ডারের প্রতিটি হাদীসই উম্মতের জন্য অনুসরনীয় নয়। যেমন -হাদীস রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১১টি বিবাহ্ করেছেন। একই সাথে তার নয়টি স্ত্রী ছিলেন। এবং তিনি মহর ছাড়া বিবাহ করেছেন।তাহলে কি এগুলো উম্মতের জন্য হালাল হয়ে যাবে ?
বিখ্যাত তাবেঈ ইব্রাহীম নাখঈ বলেছেন-
اني لاسمع الحديث فانظرالي ما يؤخذ به فاخذ به و ادع سائره.
অর্থঃ আমি হাদীস শোনার পর তার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করি। এরপর যেটা গ্রহন করা তা গ্রহন করি। আর অন্যান্য সমস্ত হাদীস ছেড়ে দেই।
ইবনে আবী লাইলা বলেন-
لا يفقه الرجل في الحديث حتي ياخذ منه و يدع.
অর্থঃ কোন ব্যক্তি ততক্ষন পর্যন্ত হাদীসে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না সে কিছু হাদীস গ্রহন করে আর কিছু হাদীস ছেড়ে দেয়।
বিখ্যাত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব বলেন-
لولا ان الله انقذني بمالك و الليث لضللت.فقيل له كيف ذلك؟ قال:اكثرت من الحديث فحيرني فكنت اعرض ذلك علي مالك و الليث فيقولان لي :خذ هذا و دع هذا.
অর্থঃ যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা‘দ দ্বারা হেফাযত না করতেন, আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। অতপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হল তা কিভাবে? তিনি বললেন আমি হাদীস নিয়ে বেশি চর্চা শুরু করেছিলাম ফলে তা আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। অতপর আমি তা মালেক(রহ) ও লাইস(রহ) এর নিকট পেশ করতাম। তারা বলতেন এটা গ্রহন কর আর এটা ত্যাগ কর। (আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃঃ ৮১,৮২)
তারা এত বড় ব্যক্তি হয়েও যখন এমন কথা বলেছেন, তাহলে সাধারন মানুষের বিষয়টি কেমন হতে পারে। এই ইবনে ওহাব (রহ) সম্পর্কে বর্ণিত আছেন তিনি এক লক্ষ বিশ হাজার হাদীস সংকলন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি অতিরিক্ত হাদীস চর্চা করার কারনে গোমরাহ হতে গিয়েছিলাম।
এখন প্রশ্ন হল, আমরা হাদীসের উপর কিভাবে আমল করব? এর উত্তর হল হাদীস সমূহের মধ্য থেকে যেগুলো উম্মতের জন্য অনুসরনীয় আমরা সেগুলোর উপর আমল করব। আর সেটাকেই সুন্নাত বলে। হাদীসের বিশল ভান্ডার থেকে সুন্নাত বের করা এটা ফুকাহাদের দায়িত্ব। এটা সাধারন মানুষের জন্য সম্ভব নয়। কেননা হাদীসের অর্থ ফুকাহয়ে কেরাম গভীরভাবে বুঝতে পারেন। ইমাম তিরমিজী (রহ) তিরমিজী শরীফে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি বর্ননা করে বলেন-
و كذلك قال الفقهاء و هم اعلم بمعاني الحديث.
অর্থঃ ফুকাহায়ে কেরাম এমই বলেছেন। আর হাদীসের অর্থ সম্পর্কে তারাই বেশি জানেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর উস্তাদ আ‘মাশ (রহ) যিনি অনেক বড় মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি একদা আবু হানিফা (রহ) কে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। আবু হানিফা (রহ) মাসআলাটির জবাব দিয়ে দেন। অতপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথা থেকে জবাবটি দিলে ? ইমাম সাহেব বললেন, আপনি আমাকে অমুক অমুক থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন সেগুলো থেকে আমি উত্তর দিয়েছি। অতপর আ‘মাশ(রহ) বলেন-
يا معشر الفقهاء! انتم الاطباء و نحن الصيادلة.
অর্থঃ হে ফকীহদের দল, তোমরাই হলে ডাক্তার আর আমরা হলাম ফার্মাসিষ্ট।
অর্থাৎ ফার্মাসিষ্ট যেমন তার কাছে অনেক ঔষধ থাকা সত্তেও সে জানে না কোন রোগের জন্য কোন ঔষধ। অনুরূপভাবে মুহাদ্দিসীনে কেরামও তাদের নিকট অনেক হাদীস থাকা সত্তেও তারা তা থেকে মাসআলা বের করতে পারেন না।এখানে লক্ষ করার বিষয় হল, আ‘মাশ(রহ) এত বড় মুহাদ্দিস হওয়া সত্তেও তিনি মওজুদ হাদীস থেকে মাসআলা ইস্তেমমবাত করতে পরেননি। তাহলে একজন সাধারন ইংরেজি শিক্ষিত লোকের পক্ষে কিভাবে সম্ভব হতে পারে? তাহলে দেখা গেল সকল সুন্নাতই হাদীস, কিন্তু সব হাদীস সুন্নাত নয়।আর আমাদেরকে হাদীস সমুহের মধ্য থেকে শুধু সুন্নাতের অনুসরন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসসমূহে লক্ষ করলে দেখা যায় তিনি কোন হাদীসে এটা বলেননি যে, তোমরা আমার হাদীসের অনুসরন করবে। বরং যেখানেই অনুসরনের কথা বলা হয়েছে সেখানে সুন্নাতে অনুসরনের কথা বলা হয়েছে।
নিম্নে নমুনা সরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল-
(1) عَنْ عِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ قَالَ صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَجْرَ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ لَهَا الْأَعْيُنُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ قُلْنَا أَوْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْصِنَا قَالَ أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِي اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.
অর্থ:হযরত ইরবাজ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,………………রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোদেরকে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে এবং (আমীরের কথা) শুনতে ও মানতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে একজন হাবশী গোলাম হয়। তোমাদের মধ্য থেকে আমার পরে যে বেচে থাকবে সে অচিরেই বিভিন্ন মতবিরোধ দেখতে পাবে। তাই তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত ধর। তা মজবূতভাবে আঁকড়ে ধর। এবং তোমরা (দ্বীনের মধ্যে )নতুন জিনিস থেকে বেচে থাক । (দ্বীনের মধ্যে)প্রতিটি নতুন জিনিসই বেদআত।আর প্রতিটি বেদআতই ভ্রষ্টতা।(মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ১৭১৪৭)
(2) قال أنس بن مالك قال لي رسول الله صلى الله عليه و سلم يا بني إن قدرت أن تصبح وتمسي وليس في قلبك غش لأحد فافعل ثم قال لي يا بني وذلك من سنتي ومن أحيا سنتي فقد أحبني ومن أحبني كان معي في الجنة.
অর্থ:হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন ,যে হে প্রিয় বৎস! যদি তুমি এভাবে সকাল ও সন্ধ্যা করতে পার যে, তোমার অন্তরে কারো জন্য কোন হিংসা নেই, তাহলে তা কর। অতপর তিনি আমাকে বললেন হে প্রিয় বৎস! তা আমার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার সুন্নাতকে মহব্বত করল সে আমাকে মহব্বত করল । আর যে আমাকে মহব্বত করল সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। (তিরমিজী শরীফ হাদীস নং ২৬৮৩)
(3) عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ.
অর্থ:হযরত মালেক (রহ) থেকে বর্ণিত,তার নিকট পৌছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষন পর্যন্ত তা ধরে রাখবে পথভ্রষ্ট হবে না।আল্লাহ তাআলার কিতাব ও তার নবীর সুন্নাত । (মুআত্তা মালেক হাদীস নং ৬৮৫)
(4) عن أبي سعيد الخدري قال Y قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من أكل طيبا وعمل في سنة وأمن الناس بوائقه دخل الجنة .
অর্থ:হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল খাবে এবং সুন্নাতের উপর আমল করবে আর মানুষ যার ক্ষতি থেকে নিরাপদে থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।( তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৫২০)
(5) قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ قَوْمٌ بِدْعَةً إِلَّا رُفِعَ مِثْلُهَا مِنْ السُّنَّةِ فَتَمَسُّكٌ بِسُنَّةٍ خَيْرٌ مِنْ إِحْدَاثِ بِدْعَةٍ.

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখনই কোন জাতি কোন বিদআত চালু করে তখন তাদের থেকে সমপরিমান সুন্নাত উঠিয়ে নেওয়া হয়। তাই একটি সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা একটি বেদআত চালু করা থেকে(অনেক) উত্তম। (মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ১৬৯৭০)
(6)قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ من أحيا سنة من سنتي قد أميتت بعدي فإن له من الأجر مثل من عمل بها من غير أن ينقص من أجورهم شيئا.
অর্থঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতসমূহের মধ্য থেকে এমন সুন্নাতকে জিন্দ করবে যা আমার পরবর্তীতে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে উক্ত সুন্নাতের উপর যাহারা আমল করিবে তাদের সকলের সমপরিমান ছাওয়াব পাবে। অথচ আমল কারীদের ছাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না। (তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৬৭৭)
(7) عَنْ أَنَسٍ أَنَّ نَفَرًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- سَأَلُوا أَزْوَاجَ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- عَنْ عَمَلِهِ فِى السِّرِّ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ آكُلُ اللَّحْمَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَنَامُ عَلَى فِرَاشٍ. فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ. فَقَالَ « مَا بَالُ أَقْوَامٍ قَالُوا كَذَا وَكَذَا لَكِنِّى أُصَلِّى وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِى فَلَيْسَ مِنِّى.
অর্থঃ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একদল সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিবিদেরকে তার গোপনে আমলের ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলেন। অতপর কেউ বলল,আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করব না। কেউ বলল আমি আর গোশত খাব না। কেউ বলল আমি আর বিছানায় ঘুমাব না। অতপর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন এবং ছানা পাঠ করলেন। আর বললেন মানুষের কি হল তারা এমন এমন বলে। অথচ আমি নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই। রোযা রাখি এবং ছেড়ে দেই।আর আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করি। যে আমার সুন্নাত থেকে বিমূখ হবে সে আমার দলভূক্ত নয়। (মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৪৬৯)
(8) عن عبد الله بن عمرو قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إن لكل عمل شرة وإن لكل شرة فترة فمن كانت شرته إلى سنتي فقد أفلح ومن كانت شرته إلى غيرذلك فقد أهلك.
অর্থঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি আমলের একটি উত্থান আছে। আর প্রতিটি উত্থানের বিরতি আছে। সুতরাং যার উত্থান আমার সুন্নাতের দিকে হবে সে সফলকাম।আর যার উত্থান আমার সুন্নাত ব্যতীত অন্য দিকে হবে সে ধবংস হবে।(সহীহ ইবনে হিব্বান,হাদীস নং ১১)
উপরে নমুনা সরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল মাত্র। প্রতিটি হাদীসে সুন্নাতের অনুসরনের কথা বলা হয়েছে।কোথাও হাদীসের অনুসরনের কথা বলা হয়নি। এজন্যই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত জামাআতকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামআহ বলে। আহলুল হাদীস নয়।
মোটকথা আমরা সর্বপ্রকার হাদীসের উপর আমলের জন্য আদিষ্ট নই। বরং হাদীসের মধ্য থেকে যা আমাদের জন্য অনুসরনীয় (আর সেটাকেই সুন্নাত বলে) আমরা তার উপরে আমল করার জন্য আদিষ্ট।আর হাদীস থেকে সুন্নাত বের করা তার দায়িত্ব নয় যে কুরআন পর্যন্ত ছহীহ করে পড়তে পরে না, হাদীসতো অনেক দুরের কথা। বরং তা এমন বিজ্ঞ আলেমের দায়িত্ব যিনি কুরআন ও হাদীসে গভীর পান্ডিত্য রাখেন।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সহীহ্ বুঝ দান করুন। আমিন!

 5,759 total views,  7 views today