প্রশ্ন : আসসালামু আলাইকুম হযরত প্রথমেই আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি খুব কঠিন একটা সমস্যায় আছি। প্লিজ সমাধান দিলে অনেক কৃতজ্ঞ থাকব। তা হল, আমি ২০০৮/০৯ শিক্ষাবর্ষে হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস ফারেগ হই। এরপর তাবলীগে সাল লাগিয়ে ছোট একটি মাদ্রাসা ও কিছু কৃষি কাজে সময় দিচ্ছি। পাশাপাশি তাবলীগের কাজে সাধ্যমত সময় দিচ্ছি। বর্তমানে সোমালিয়া সফরে আছি। সমস্যা হল, আমার বাবা একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। আর মা একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষিকা। মোটামুটি পর্দার সাথেই তিনি শিক্ষকতা করছেন। বাবা প্রায় ১৯৮৪ থেকে রাজশাহী কৃষি ব্যাংক এ কর্মরত আছেন। আর মা ১৯৮৬ থেকে স্কুলে। সাংসারিক জীবনের শুরুটা অনেক অভাবে শুরু হয়েছিল। ঐ সময় বেতনও খুব বেশী ছিল না। যাক ১৯৯৬ সালে এসে তিনি তাবলীগের সাথে জড়িত হন এবং ৩ চিল্লা সম্পন্ন করেন। দ্বীনের বুঝ পেয়ে এরপর আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। এই সময় এটাও বুঝতে পারেন যে, তার এই চাকরী শরীয়ত সম্মত নয়। কিন্তু আমাদের দুই ভাই ও একবোনের পড়াশোনার খরচ আর সংসারের খরচের কথা খেয়াল করে আর বিকল্প কোন রাস্তা না পেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাকুরি চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মাঝে নিজেদের অল্প অল্প করে জমানো টাকা দিয়ে গ্রামে পর্যায়ক্রমে ১০ বিঘার মত জমি ক্রয় করেন। যার মুল্য ঐ সময় হিসেবে ৫ লক্ষ টাকার মত। আর ১৯৯৯ সালে আমাদের সদর উপজিলার পৌরসভায় ৭ শতক জমি কিনেন যার মুল্য ১২০,০০০ টাকা ছিল। পরে সেই জমির উপর টিনশেড একটি বাড়িও করেন। ২০০৩ এ বাবা একটা ব্যাবসা শুরু করেন। তবে অভিজ্ঞতা কম থাকায় ব্যবসা ৩ বছরের বেশী টিকেনি। এই পরিস্থিতিতে বাবা দাওয়াতের কাজে অনেকটা অনিয়মিত হয়ে পড়েন। উনি ২০০৭ এ অপর একটি (৬ শতক) জমি পাশ্বেই কিনেন যার মুল্য ৭০০০০০ টাকা । উপরে উল্লেখিত সব সম্পদে বাবা মা দুজনের টাকা মোটামুটি সমান সমান। এরপর ২০০৮ এ তিনি নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে হাউজ লোন নেন। দুই কিস্তিতে ২৫,০০০০০ ( পচিশ লক্ষ টাকা।) ওই টাকা দিয়ে সেখানে ৩ তলা ফাউন্ডেশন করে বাড়ী করেন। আমার জানামতে ঐ লোনের সুদের পরিমাণ সম্ভবত ২ থেকে ৫ %। তার চিন্তা ছিল ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বাড়ী করে উনি চাকুরী ছেড়ে দিবেন আর রিটায়ার্ড এর টাকা দিয়ে সেই লোন থেকে মুক্ত হবেন। বর্তমানে সেই বাড়ী থেকে মাসপ্রতি ২৫০০০ হাজার টাকা ভাড়া পাচ্ছি। এবং যথাসম্ভব প্রতি মাসে তার বেতন থেকে ৪০% টাকা ব্যাংক কেটে নেয়। মোট সম্পদে মায়ের অংশ ১০ লক্ষের মত। আর বাবার ৩২ লক্ষের মত। যা খেয়েছি, পড়েছি তা বাদে এটা হল আমাদের বর্তমান সম্পদ। চাকুরি জীবনে সৎ অফিসার হিসেবে বাবার সুনাম আছে। বড় ছেলে হিসেবে বাবার সাথে আমার সম্পর্ক খুবই ভাল। যার কারনে আমি বউ ছেলে সহ মা বাবার সাথেই আছি। প্রয়োজনীয় টাকা আমি মাঝে মাঝে মায়ের কাছ থেকে নেই। আর ছোট ভাই ঢাকায় একটি ইন্জিনিয়ারিং ইউনিভারসিটিতে পড়ছে। সেও ১ চিল্লা করে ২ বার সময় দিয়েছে। বার বার আব্বাকে হেকমতে চাকরি ছাড়ার কথা বলেছি। তিনিও আশ্বাস দিয়েছেন। আবার ছাড়তে না পারার কারনে অনেকটাই অনুতপ্ত। মাঝে মাঝে সেই বাড়ী আমাকে লিখে দেওয়ার কথাও বলে। কিন্তু আমি না করে আসছি। এ বছর তারা দুজনই হজ্ব সফরের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। যাওয়ার আগে দুজনের চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার কথাও চলছে। এখন ১। এই পরিস্থিতিতে আমার কি করনীয়? ২। তাদের এই সমুদয় সম্পদের সন্দেহযুক্ত অংশ কে বৈধ করার কোন উপায় আছে কি? এবং পরবর্তীতে ওয়ারিশ হিসেবে আমাদের জন্য এই সম্পদ ব্যবহার করার কি ছূরত হতে পারে? ৩। বাড়ী ভাড়ার টাকা আমাদের জন্য বৈধ হবে কি? ৪। বাবার রিটায়ার্ড এর টাকা আমাদের জন্য বৈধ হবে কি? প্রশ্ন দীর্ঘায়িত হওয়ায় মাফ চাচ্ছি। সুন্দর সমাধান এর অপেক্ষায় রইলাম। মাআছ্ছালাম।

উত্তর :

ওয়া আলাইকুমুস সালাম
১। সূদের ভয়াবহতা খুবই কঠিন। সূদের সাথে সম্পৃক্ত থাকা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে যুদ্ধ করার নামান্তর। আর এ বিষয়ে আপনিও ভালোই জেনে থাকবেন। তাই আপনার কর্তব্য হল অতি দ্রুত আপনার আব্বাকে এ চাকরি থেকে ফিরিয়ে আনা। আর তিনি অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট খালেছভবে তাওবা করে নিবেন।

২। হারাম অংশ তাদের মালিককে ফিরিয়ে দিলে সমূদয় সম্পদ আপনাদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব হলে গরীবদেরকে ছাওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সদকাহ করে দিবে। কাজেই আপনার আব্বা কর্তৃক প্রদেয় ৩২ লক্ষ টাকার পুরোটাই যদি তার বেতন থেকে এসে থাকে তবে ৩২ লক্ষ টাকাই সদকাহ করে দিবে। আর উক্ত ৩২ লক্ষ টাকার কিছু অংশ হালাল হয়ে থাকলে (যেমন আপনার আব্বার পৈতৃক সম্পত্তি বা অন্য কোন হালাল উপার্জন থেকে কিছু দিয়ে থাকলে) তা সদকাহ করতে হবে না।

৩। হালাল ও হারাম মালের সমন্বয়ে উক্ত বাড়ি নির্মাণ হলে হালাল মালের আনুপাতিক হার অনুযায়ী তা থেকে উপকৃত হওয়া বৈধ হবে। যেমন ধরা যাক বাড়ি নির্মাণে ১০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে যার মধ্য থেকে ৫ লক্ষ টাকা হালাল। আর বাড়ি ভাড়া ১০,০০০ টাকা। তবে ৫ হাজার টাকা আপনাদের জন্য বৈধ হবে। বাকী ৫,০০০ সদকাহ করা জরুরী। আর বাড়ি নির্মাণের পুরো টাকাই হারাম হলে (যেমনটি আপনার প্রশ্ন থেকে বুঝে আসে, আপনার আব্বা ব্যাংক লোনের ২৫,০০০০০ টাকা দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং তা আপনার আব্বার বেতন থেকেই কর্তিত হচ্ছে) পুরোটাই সদকাহ করে দিবে।

৪। না, এ টাকাও আপনাদের জন্য বৈধ হবে না। পুরোটাই সদকাহ করা জরুরী।

সুত্রসমূহঃ সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৭৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪১৭৭; রদ্দুল মুহতার ২/২৯২, ৫/৯৯, ৬/১৮২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৯৪; হিদায়া ৩/৬৮,৬৯; ফাতহুল কদীর ৮/২৫৫; মাবসূতে সারাখসী ১১/৭৭; বাদায়েউস সানায়ে ৬/১৪৯; ফাতাওয়া উসমানী ৩/১২০-১২৪

 822,395 total views,  392 views today